বুধবার, ০১ ফেব্রুয়ারী ২০২৩, ০৭:০৭ অপরাহ্ন
Bengali Bengali English English
সদ্য পাওয়া :

আইনি জটিলতায়  বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ ॥ শিক্ষার্থী-অভিভাবক ও শিক্ষকদের মাঝে ক্ষোভ

কাফি পারভেজ:
  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ১ জানুয়ারী, ২০২৩
  • ৮৯ জন সংবাদটি পড়ছেন

কাফি পারভেজ:

আইনি জটিলতায় একমাস ধরে বন্ধ বকশিগঞ্জ উপজেলার জিগাতলা পাখিমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ। বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি বিদ্যালয়ের ভূমির মালিকানা দাবি করে মামলা দায়ের করায় আদালতের নির্দেশে বন্ধ রয়েছে নতুন ভবনের নির্মাণ কাজ। নতুন ভবনের জন্য বিদ্যালয় মাঠের বিভিন্ন স্থানে করে রাখা গর্তের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীরা। দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

বকশিগঞ্জ পৌর শহরের পাখিমারা চৌরাস্তা মোড় এলাকার কামালপুর-জামালপুর মহাসড়কের পাশে ঈদগাঁ মাঠ সংলগ্ন পশ্চিমে ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান জিগাতলা পাখিমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। চরকাউরিয়া মৌজার সিএস দাগ নং ১২৬১, আরওআর দাগ নং-১২৬১ এবং বিআরএস দাগ নং-৩০৭২ এ দানকৃত ৪৯ শতাংশ ভূমিতে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়টির জন্য প্রথমে একটি টিনশেড ঘর তুলে শিশু শিক্ষার কার্যক্রম শুরু হয়। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার সময় টিনশেড ঘর থেকে পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে সরকারি অর্থায়নে একতলা পাকা ভবন নির্মিত হয়।

জানা গেছে, চলতি বছরের ২৫ আগস্ট জিগাতলা পাখিমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির পরিচালনা পরিষদের ১০তম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন দুলাল ওরফে দুলাল হোসেন অব্যবহৃত একতলা পাকা ভবনটি ভেঙে নতুন ভবন তৈরীর প্রস্তাব করেন। আনোয়ার হোসেনের এ প্রস্তাবে উপস্থিত সকলেই আলোচনা শেষে নতুন অতিরিক্ত শ্রেণি কক্ষ নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। পরবর্তিতে ২০ অক্টোবর ম্যানেজিং কমিটির ১১তম সভায় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আওয়াল বিদ্যালয়টির জমি সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে উপস্থিত সবাইকে অবহিত করেন এবং নতুন ভবন নির্মাণে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে বলেও জানান। জমি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে উপস্থিত সকলের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। প্রধান শিক্ষকের প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি দাতা সদস্যর নাতি আনোয়ার হোসেন দুলাল তার সকল ওয়ারিশগনসহ বিদ্যালয়ের নামে জমি দিতে রাজি হয়ে জমি রেজিষ্ট্র্রি করে নেয়ার সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার প্রস্তাব করেন। তার প্রস্তাবটি পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহনের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।

বকশিগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, জিগাতলা পাখিমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরাতন জরাজীর্ণ ভবন নিলামে বিক্রির জন্য গত ২৭ সেপ্টেম্বর নিলাম দরপত্র বিজ্ঞপ্তি নং-০১/২০২২-২০২৩ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নিলামে অংশ নেয়। সর্বো”চ কম দরদাতা হিসেবে মেসার্স মদিনা এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক বিদ্যালয়টির ভূমি ডিজিটাল সার্ভে শেষে পিইডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে একটি চারতলা ভবনের বর্তমান ২ হাজার ২০০ বর্গফুটের দ্বি-তল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। এর ব্যয় ধরা হয় প্রায় এককোটি টাকা। বর্তমানে বিদ্যালয়ের পুরাতন একতলা ভবনটির স্থানে এই দ্বি-তল ভবন নির্মাণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একতলা ভবনটি ভেঙে চলতি বছরের নভেম্বর থেকে দ্বি-তল ভবনের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের ভূমি সংক্রান্ত জটিলতা সৃষ্টি করে বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি। বিদ্যালয়টির ভূমির কথিত মালিকানা দাবি করে ভূমি বেদখল ও বিদ্যালয়টি উচ্ছেদের পাঁয়তারা চালাচ্ছেন তিনি। এদিকে নতুন ভবনের কাজ শুরুর এক মাস না যেতেই বিদ্যালয়টির পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও তার ওয়ারিশ ১১জন বাদী হয়ে বিদ্যালয়ের ২৩ শতাংশ ভূমির মালিকানা দাবী করে বিদ্যালয়টির পরিচালনা পরিষদের সভাপতি এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সাত জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। এরপর আদালতের নির্দেশে ভবন নির্মাণ বন্ধ হয়ে যায়।

এদিকে, বিদ্যালয়ের পুরাতন একতলা ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণ কাজের জন্য গর্ত করে রাখা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় রয়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বর্তমানে শ্রেণি কক্ষের অভাবে ২১২জন শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রম চলছে ফ্লাডসেন্টার ভবনটিতে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মামলার ১১জন বাদীর পাঁচজনই মামলার কোনো কাগজ পত্রে স্বাক্ষর করেননি বলে জানিয়ে বলেন, যেহেতু আমাদের পূর্বপুরুষেরা বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করে গেছেন কাজেই এখানে আমাদের কোনো দাবী দাওয়া নাই। এ ছাড়াও বলেন, পূর্বপুরুষদের সম্মান রক্ষায় এখন লিখে দেওয়ার প্রয়োজন মনে করেন তারা।

অবিভাবক মো. ইদ্রিস আলী ও বিদ্যালয়টির সাবেক ছাত্র ব্যবসায়ী গোলাম রব্বানী বলেন, বিষয়টি এলাকাবাসীকে চরমভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের জমি রক্ষায় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা জোড়ালো ভাবে নিতে হবে।জোড়ালো ব্যবস্থা না নিতে পারলে বিদ্যালয়ের সম্পত্তি ওই স্বার্থানেষীদের হাতে চলে যাবে। সেই সাথে এলাকার দরিদ্র ও গরিব শিক্ষার্থীরা বিনা  বেতনে পড়ালেখার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স দূর্গা এন্টারপ্রাইজ এর মালিক শ্যামল চন্দ্র সাহা জানান, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পিইডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় ২০২২-২০২৩ অর্থবছরে বরাদ্ধে ভবনটি নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৯২ লক্ষ ৬ হাজার সাতশ সাত টাকা। যা ২০২২ সালের ২০ আগস্ট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কর্তৃক বিদ্যালয় ভবনটির কাজ শুরু করার জন্য কার্যাদেশ এর পত্র পাই। সে অনুযায়ী ২০২৩ সালের ১৭ এপ্রিলের মধ্যে কাজ  শেষ করার কথা। কিন্ত নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরু করার এক মাস না যেতেই আইনি জটিলতায় কাজ বন্ধ করতে হয়। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবেন বলে আশা করছি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল আওয়াল বলেন, আমি এ বিদ্যালয়ে যোগদান করার পর থেকেই জেনে আসছি এ এলাকার দানবীর প্রয়াত রিয়াজ উদ্দিন সরকার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৪৯ শতক জমি দান করেছেন। এখন তাঁর নাতিরা জমির মালিকানা নিয়ে কিভাবে প্রশ্ন  তোলেন? এতোদিন পর এ ধরনের দাবী হাস্যকর। বিদ্যালয় রক্ষার স্বার্থে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হচ্ছে।

মামলার বাদী বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন দুলাল সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে বিদ্যালয়ের যেখানে ভবন সেই জমিটি তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি। তাঁর বাবার অংশের ৫৬ শতাংশের মধ্যে ৩৩ শতাংশ বিক্রি করা হয় বাকি ২৩ শতাংশ জমি দাবী করে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

স্থানীয় এলাকাবাসী সাংবাদিক কাফি পারভেজ বলেন, জিগাতলা পাখিমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমি সংক্রান্ত জটিতলার সৃষ্টি করে বিদ্যালয়টি ভূমি দখল ও উচ্ছেদের পায়তারা চালাচ্ছেন বিদ্যালয়টির পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন দুলাল। তিনি বিদ্যালয়টির পরিচালনা পরিষদের ১০তম সভায় অব্যবহৃত একতলা পাকা ভবনটি ভেঙে একই স্থানে নতুন ভবন তৈরীর প্রস্তাব করেন। আবার তিনিই ওই জমির মালিকানা দাবী করে মামলাও দায়ের করেছেন। যা হাস্যকর মনে করছেন এলাকাবাসী। এরপরেও আনোয়ার হোসেন দুলাল পরিচালনা পরিষদের সহ-সভাপতি হিসেবে বহাল তবিয়তে থাকায় তার ক্ষমতার উৎস কোথায় তা নিয়ে এলাকার সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ঠ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

অন্যদিকে, আইনি জটিলতার অবসান হওয়ার পর বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. শামছুল হক।

 

 

 

পছন্দ হলে শেয়ার করুন

এ ধরনের আরও সংবাদ
সাপ্তাহিক বকশীগঞ্জ
        Develop By CodeXive Software Inc.
HelloBangladesh