শুক্রবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২০, ০৮:৩৭ পূর্বাহ্ন
Bengali Bengali English English

জামালপুরে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম ‘ভূমিদস্যু জীবন’

স্টাফ রিপোর্টার, বকশীগঞ্জ
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২০
  • ৬৯৯ জন সংবাদটি পড়ছেন

জামালপুরঃ জমিদখল, ঠকবাজি, প্রতারণা ও মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ভূমি মালিকদের হয়রানীর মুখে সর্বশান্ত করছে ভূমিদস্যু এমদাদুল হক জীবন। ভূমি মালিকদের কাছে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম জীবন। তার কবলে পড়ে অসংখ্য ভূমি মালিক সর্বশান্ত হয়ে পথে বসেছে।

ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে এসব অপকর্ম করছে হাইব্রিড এই আওয়ামী লীগ নেতা। এক সময় জামায়াতের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। পরে বিএনপি হয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছায়াতলে ভিড়েছেন। সরকার আসে সরকার যায় জীবনের ভূমিদস্যুতার গতি থাকে একই রকম। মতলববাজ এই ভূমিদস্যু এবারও ভোলপাল্টে অর্থ ছিটিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের কতিপয় নেতাকর্মীদের সাথে গড়ে তুলেছেন বিশেষ সখ্যতা। এই হাইব্রিড নেতার দাপটে মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোণঠাসা। ক্ষমতার দাপটে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তার ভুমিদস্যুতায় দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হওয়ায় মাঠপর্যায়ে চাপা ক্ষোভ রয়েছে বলে জানালেন ক্ষুব্ধ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধুই কি বিএনপি- জামায়াতের কানেকশন ছিল জীবনের। জেএমবি’র কানেকশনও ছিল এই বর্ণচোরার। তার ছত্রছায়ায় জেএমবি ঘাটি খ্যাত জামালপুর শহরের শেখের ভিটা এলাকায় ছাত্রাবাসগুলোতে কর্মী রিক্রুট ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতো জঙ্গিরা। এসব ছাত্রাবাসগুলোতে পুলিশ ও র‍্যাব অভিযান চালিয়ে অসংখ্য জঙ্গি গ্রেপ্তার করেছিল।

সে সময় এমদাদুল ইসলাম জীবন জেলা জামায়াতের আমীর সামছুল ইসলামের দেহরক্ষী ছিল। জামায়াতের সেই আমীরকে প্রতিদিন মোটরসাইকেলের পিছনে বসিয়ে শহরের ঘুরাফেরা করতে দেখা যেত জীবনকে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেখের ভিটা গ্রামসহ শহরের বিভিন্ন এলাকার একাধিক ব্যক্তির সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

কে এই জীবন? এমদাদুল হক জীবন, বাড়ি জামালপুর শহরের শেখের ভিটা গ্রামে। তাদের আদি বাড়ি রংপুর জেলার গ্রামে। জীবনের হতদরিদ্র বাবা ইউসুফ আলী কাজের খোঁজে জামালপুরে আসেন। মোহিনী বিড়ি কোম্পানিতে গরু রাখাল হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। মোহিনী বিড়ির মালিক মরহুম সীতারাম কানুর মোসাহেবি করে গরু রাখাল থেকে এক লাফে কোম্পানির সরকার (ক্যাশিয়ার) সর্বশেষ ম্যানেজার পদ বাগিয়ে নেন। বিয়ে করেন জামালপুর শহরের শেখের ভিটা গ্রামের বিড়ি শ্রমিক জেসমিনকে। এই দম্পতির দৃশ্যমান বৈধ-অবৈধ এসব আয়ের আড়ালে ছিল অদৃশ্য আয়ও। লাফিয়ে বাড়তে থাকে অর্থ সম্পদ। খুব অল্প সময়ে বাড়ি গাড়ি বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক বনে যান।

বাবার অর্থসম্পদ প্রথম দিকে জামায়াতের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে ও সংগঠনে অর্থ লগ্নি করেন জীবন। সেই সময়ে জেলা জামায়াতের আমীর সামছুল ইসলামের নজরে পড়েন। তাদের মধ্যে গড়ে উঠে বিশেষ সখ্যতা। ওই জামায়াত আমীরের দেহরক্ষী দায়িত্ব পালনকালে সর্বসময় শহরে মোটরসাইকেলে ঘুরাফেরা করতে দেখা যেত জীবনকে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াতের জোট সরকার গঠনের পর সক্রিয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন।

বিএনপির মিছিল মিটিংয়ে সামনের কাতারে দেখা যেত জীবনকে। নিয়েছেন বিএনপি-জামায়াত সরকারের নানা সুবিধা। তার জমি ব্যবসা, ভূমি দস্যুতা, প্রতারণাসহ নানা অপকর্ম ও ব্যবসা বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে বছর দুয়েক আগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে যোগ দেন। খুব অল্প সময়ে মোসাহেবী ও ভূমিদস্যুতা থেকে আয় করা টাকা ব্যয় করে দলে তৈরি করেছেন শক্ত অবস্থান। ক্ষমতাসীন দলের নাম ভাঙ্গিয়ে জমি দখল, ফাঁদে ফেলে কম মূল্যে ভূমি মালিকদের জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা, আবার নিজের নামে বায়নাপত্র বাবা-মার নামে সাব কবলা রেজেষ্ট্রি করে জমির মালিকদের বিরুদ্ধে বয়নাপত্রের শর্তভঙ্গের অভিযোগ এনে মিথ্যা মামলা দায়ের করে জমি মালিকদের হয়রানীর অভিযোগ উঠেছে জীবনের বিরুদ্ধে।

তার ফাঁদে পড়ে প্রতারণার শিকার জামালপুর শহরের কাচারীপাড়ার ভূমি মালিক অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারি সচিব মরহুম খলিলুর রহমানের স্ত্রী শিরিন রহমান বলেন, শহরের মনিরাজপুরে আমার ৭৬ শতাংশ জমির মধ্যে ২৪ শতাংশ জমি ১০ লাখ টাকা মূল্যে সাব কবলা রেজেষ্ট্রি করে কিনে নেয় এবং একই দিন ৫২ শতাংশ জমি ১০ লাখ টাকা পরিশোধ দেখিয়ে বয়নাপত্রে স্বাক্ষর নেয়। আমার হাতে ১০ লাখ টাকা দেয়। বয়নাপত্রের ১০ লাখ টাকা দাবি করলে বলে আপনার সাথেতো হিসাবকিতাব শেষ হয়নি। বয়নাপত্রের চুক্তি অনুযায়ী ৩ মাস পর জমি সাব কবলা রেজেষ্ট্রি করে নেয়ার সময় এই ১০ লাখ টাকা যোগ করে দিবো। বায়নার সময়সীমা ৩ মাস শেষে ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও জমি রেজেষ্ট্রি করে নেয় না। নিয়ম অনুযায়ী বায়নাপত্র বাতিল হয়ে যায়। অনেক তাগাদার পর অন্যত্র আমি জমি বিক্রি করে দেয়। ওই বয়নাপত্র দাবি করে আমার বিরুদ্ধে বায়নাপত্রের চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে। আমার বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার খবর শুনে আমার স্বামী খলিলুর রহমান স্ট্রোক করে দুই মাস বিছানায় শয্যাশায়ী থেকে মারা যায়। আমাকে মিথ্যা মামলা দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে হয়রানী করে আসছে ভূমিদস্যু জীবনের প্রতারণা ও হয়রানীর হাত থেকে মুক্তি চান এই বিধবা অসহায় নারী।

এমনই প্রতারণার শিকার শহরের সর্দারপাড়ার পাঁচরাস্তা মোড়ের মরহুম আইয়ুব আলীর স্ত্রী মাসুমা হুসনী অভিযোগ করে বলেন, আমার মতো অসংখ্য ভূমি মালিক জীবনের খপ্পরে পড়ে হয়রানীর শিকার কেউ কেউ সর্বশান্ত হয়েছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পর জমি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেয় এতিম মেয়েদের মানুষ করার জন্য। সিংহজানী মৌজার শেখেরভিটা এলাকায় আমার ২৭ শতাংশ জমি এমদাদুল হক জীবন নিজ নামে বায়নাপত্র করেন ২০১২ সালে। পরে তার বাবা ইউসুফ আলীর নামে সাব কবলা রেজেষ্ট্রি করে নেয় কৌশলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে। সে সময় বাবা ছেলের ছলচাতুরী বুঝতে পারিনি। পরে ২০১৫ সালে আমার নামে বায়নাপত্রভঙ্গের উকিল নোটিশ করে। একই দাগে বাকি ১৮ শতাংশ জমি গ্রাস করার জন্য ২০২০ সালে জীবন বাদী হয়ে আমার নামে মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। অবশিষ্ট থাকা ১৮ শতাংশ জমিতে দেয়াল নির্মাণ করতে গেলে তার লালিত পালিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে বাঁধা দেয়। জমিতে আসলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেয় জীবন বাহিনীর সন্ত্রাসীরা। কথায় কথায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দাপট দেখায়। আবার শুনছি, জীবন ১১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে যাচ্ছে। এক সময় প্রকাশ্য জামায়াত করে বেড়ানো এমন একজন মানুষ আওয়ামী লীগের সভাপতি হলে এলাকায় আমাদের বসবাস করা দায় হয়ে পড়বে। এই হাইব্রিড আওয়ামী লীগ নেতার অত্যাচার নির্যাতন ও হয়রানী থেকে মুক্তি পেতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি কামনা করেছেন এই ভুক্তভোগী অসহায় নারী।

মাদারগঞ্জের কয়রা গ্রামের জান্নাতুল ফেরদৌস অভিযোগে বলেন, জামালপুর শহরের শেখের ভিটা এলাকায় আজম চত্বরে আমার ৫ শতাংশ জমি জবর দখল করে দেয়াল নির্মাণ করেছে। ভয়ে জমিতে যেতে পারছি না। জমি দখলের অভিযোগ করেছেন শহরের সর্দারপাড়া পাঁচরাস্তা মোড়ের রাহেলা বেগম। তার শেখের ভিটা এলাকায় আজম চত্বরে ৫ শতাংশ জমি দখল করে রেখেছে জীবন। জমিতে প্রবেশ করলে হাত-পা ভাঙ্গাসহ প্রাণনাশের হুমকি দেয় জীবনের ভাই জনিসহ স্থানীয় সন্ত্রাসীরা।

শিরিন রহমান, মাসুমা হুসনী, জান্নাতুল ফেরদৌস ও রাহেলা বেগমের মতো এনামুল হক, আব্দুল কাইয়ুম পলাশ, মির্জা ফকরুজ্জামান, হেলালুল ইসলাম, মোহাম্মদ শাহজাহানসহ অসংখ্য ভূমি মালিক জীবনের খপ্পরে পড়ে জমি বেদখল, মিথ্যা মামলা ও হয়রানীর শিকার হয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতিগ্রস্ত কেউ কেউ পথে বসেছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে এমদাদুল হক জীবন বলেন, আমি বিএনপি-জামায়াত করিনি । জমি দখল, প্রতারণাসহ যেসব অভিযোগ আমার নামে এসেছে তা সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।

পছন্দ হলে শেয়ার করুন

এ ধরনের আরও সংবাদ
সাপ্তাহিক বকশীগঞ্জ
        Develop By CodeXive Software Inc.
themesba-lates1749691102