ইসলামপুরে অনুপ্রবেশকারীদের মুল্যায়ন, বঞ্চিত আ’লীগের ত্যাগী নেতারা

রোকনুজ্জামান সবুজ,জামালপুরঃ ‘অন্য দল থেকে আ’লীগে নয়’ এবং “অনুপ্রবেশকারীদের দলের কমিটিতে নয়” বাংলাদেশ আ’লীগের শীর্ষ নেতাদের এমন নির্দেশ তোয়াক্কা করছেন না ইসলামপুর উপজেলা আ’লীগের নেত্রীবৃন্দু সহযোগীরা। দলের মধ্যে নিজের ব্যক্তিগত অবস্থান শক্তিশালী করতে তিনি ফুলের তোড়ায় বরণ করে নিয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতের অসংখ্য নেতা কর্মীদের। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিরোধী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের অধিক মুল্যায়ন করায় তারাই এখন ইসলামপুর উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন আ’লীগের রাজনীতিতে চালকের আসনে রয়েছেন। ইতিপূর্বে যাদের বিরুদ্ধে আ’লীগ নেতা-কর্মীদের নির্যাতনের ইতিহাস রয়েছে তারাই এখন আ’লীগে এসে অধিক মুল্যায়িত হয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও অনুপ্রবেশকারীদের অধিক মুল্যায়নের কারণে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত আ’লীগ নেতা-কর্মীরা চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে জানাগেছে।
স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, ইসলামপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদুর রহমান আনসারী বর্তমানে উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। তাকে আবার নৌকা প্রতীক দিয়ে ইসলামপুরের গাইবান্ধা ইউপি চেয়ারম্যানও বানানো হয়েছে। এতে দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত আ’লীগ নেতা গাইবান্ধা ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক সরদার ও সাবেক সভাপতি মোসলিম উদ্দিনকে চরমভাবে অবমুল্যায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইসলামপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি ও কুলকান্দি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি জুবাইদুর ইসলাম দুলাল বিএসসি এখন ইসলামপুর উপজেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। কুলকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের বিগত নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ইউনিয়ন আ’লীগের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক কাজী হাফিজুর রহমানকে বাদ দিয়ে জুবাইদুর ইসলাম দুলাল বিএসসিকে নৌকা প্রতিক দেওয়ায় এখানে স্বতন্ত্রী প্রার্থী জিয়াউর রহমান সনেট বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। কুলকান্দি ইউনিয়ন যুবদলের নেতা খোরশেদ আলম হাসমত এখন কুলকান্দি ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি এবং কুলকান্দি ইউনিয়ন যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফারুকুল ইসলাম এখন কুলকান্দি ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন হয়েছেন। এছাড়াও কুলকান্দি ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি আমজাদ হোসেন এখন কুলকান্দি ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন। ইসলামপুরের চিনাডুলি ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুস ছালাম আ’লীগে যোগ দিয়ে চিনাডুলি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছেন নৌকা প্রতিক নিয়ে।
বেলগাছা ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি ফরহাদুজ্জামান জানান, বিএনপি থেকে আ’লীগে অনুপ্রবেশকারী জাহাঙ্গীর আলমকে বেলগাছা ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সভাপতি করা হয়েছে। বেলগাছা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক পদে আ’লীগের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা আমিনুর ইসলাম মানু সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে নির্বাচিত হলেও তাকে বাদ দিয়ে বিএনপি পরিবারের নেতা তোতা মিয়াকে সাধারণ সম্পাদক বানানোর অপচেষ্টা করছেন। ইসলামপুরের নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের আ’লীগ নেতা ছাইদুর রহমান, ইব্রাহীম কামার, জবান আলী, আমিনুর সরদার, আব্দুল করিম ও আমির হোসেন জানান, নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডেই সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি গঠিত হলেও স্থানীয় এমপি তাহা মানছেন না। স্থানীয় এমপি তার পছন্দমতো লোক দিয়ে পকেট কমিটি করতে চান। সম্প্রতি স্থানীয় আ’লীগে অনুপ্রবেশকারী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক ধর্মবিষয়ক সম্পাদক শফিকুল আলম ডবল মুন্সী। এছাড়াও ওই পকেট কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় সহযোগীতা করছেন স্থানীয় আ’লীগ নেতা আছাদুজ্জামান মাষ্টার ও রেজাউল করিম রেজা মাষ্টার। তারা যোগসাজশে পকেট কমিটি গঠনের লক্ষ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মূলত: অনুপ্রবেশকারী বিএনপি জামায়াত নেতাদের কাছ থেকে মোট অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে বসিয়ে অধিক মুল্যায়নের অপচেষ্টা করছেন।
ইসলামপুর উপজেলা আ’লীগের ও তার সহযোগীরা অন্যায়ভাবে নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের নবগঠিত কমিটির সভাপতি দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত আ’লীগ নেতা আমিনুর ইসলাম সরদার ও সাধারণ সম্পাদক ভুট্টো সরদারকে বাদ দিয়ে সভাপতি পদে বিতর্কিত আ’লীগ নেতা শাহজাহান ও সাদুল্লাহ সরদারকে সাধারণ সম্পাদক পদ দেওয়ার হীন প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। একইভাবে নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত সভাপতি দীর্ঘদিনের ত্যাগী আ’লীগ নেতা আমির হোসেনকে বাদ দিয়ে সম্প্রতি আ’লীগে অনুপ্রবেশকারী স্থানীয় যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সহিদুর রহমানকে সভাপতি করার অপচেষ্টা করছেন। একইভাবে ৭নং ওয়ার্ড আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আ’লীগের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা ইব্রাহীম কামার মেম্বারকে বাদ দিয়ে ওই পদে স্থানীয় বিএনপির সমর্থক আজিজল হককে নেওয়ার অপচেষ্টা করছেন। আ’লীগের পকেট কমিটি গঠনকারী ওই চক্রটি নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের নবনির্বাচিত সভাপতি সাইদুর রহমান কাজী এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিমকে অন্যায়ভাবে বাদ দিয়ে সভাপতি পদে জামাল উদ্দিন কাজীকে এবং সাধারণ সম্পাদক পদে অন্যায়ভাবে মজিবর রহমান সেককে অন্তর্ভুক্তির অপচেষ্টা করছেন। এছাড়াও জাহাঙ্গীর আলম গংরা নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের সম্মেলনে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে সাধারণ সম্পাদক পদে নির্বাচিত লিটন সেককে বাদ দিয়ে অন্যায়ভাবে বিএনপির সমর্থক আব্দুর রৌফকে অন্তর্ভুক্তির অপচেষ্টা করছেন। নোয়ারপাড়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রেজাউল করিম রেজা এখন ৪নং ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি। একই ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ড আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে জামায়াত পরিবারের সদস্য রুহুল আমিন।
ইসলামপুরের নোয়ারপাড়া ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা জানান, স্থানীয় এমপি ফরিদুল হক খান দুলাল নোয়ারপাড়া ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে উপেক্ষা করে তার পছন্দমতো লোক দিয়ে বিভিন্ন ওয়ার্ডে পকেট কমিটি করার চেষ্টা করছেন। এমপির নানা অসাংগঠনিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কেউ আপত্তি জানালেই তাকে আ’লীগ থেকে বহিস্কারের হুমকি দেওয়া হচ্ছে এবং ইউনিয়ন আ’লীগের কমিটি ভেঙ্গে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও স্থানীয় এমপির আশির্বাদপুষ্ট একটি চক্র মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতেই নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের অধিকাংশ ওয়ার্ড কমিটি পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। তারা অনুপ্রবেশকারী বিএনপি জামায়াত নেতাদের আ’লীগের কমিটিতে নিয়ে পূণর্বাসনের অপচেষ্টাও করছেন।
ইসলামপুর উপজেলার নোয়ারপাড়া ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি লুৎফর রহমান জানান, নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডেই সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের সবকটি ওয়ার্ড আ’লীগের কমিটিতেই দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতারা দায়িত্ব পেয়েছেন। নবগঠিত ওইসব কমিটিতে অনুপ্রবেশকারী কোন বিএনপি জামায়াত নেতা-কর্মীদের স্থান দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ড আ’লীগের কমিটি অনুমোাদনও দেওয়া হয়েছে। ওইসব কমিটি অন্যায়ভাবে পরিবর্তন করলে দলে অভ্যন্তরীণ কোন্দল সৃষ্টি হবে এবং যেকোন মূহুর্তে রক্তক্ষয়ি সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। অথচ ইসলামপুর উপজেলা আ’লীগের সভাপতি স্থানীয় এমপি আলহাজ ফরিদুল হক খান দুলাল সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ কমিটি মানতে চাইছেন না। তিনি নোয়ারপাড়া ইউনিয়ন আ’লীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে উপেক্ষা করে তার পছন্দমতো লোক দিয়ে ৯টি ওয়ার্ডেই অসাংগঠনিকভাবে পকেট কমিটি গঠনের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। এই অসাংগঠনিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আপত্তি করায় স্থানীয় এমপি অন্যায়ভাবে নোয়ারপাড়া ইউনিয়ন আ’লীগের বর্তমান কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বলেও তিনি জানান।
ইসলামপুরের গাইবান্ধা ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস জানান, গাইবান্ধা ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক নেতা উসমান গনি, দুলাল মিয়া,কবির উদ্দিন, ইব্রাহীম, হাসেম আলী, ইয়াকুব আলী, জয়নাল আবেদীন, রিয়াজুল হক ও সুলতান মিয়া সম্প্রতি আ’লীগে অনুপ্রবেশ করেই গাইবান্ধা ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ড আ’লীগের কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন।

রোকনুজ্জামান সবুজ
জামালপুর।

নিউজটি শেয়ার করুন..

     এই বিভাগের আরো খবর
ব্রেকিং নিউজঃ