কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্তৃত্ব নিয়ে ‘টাগ অব ওয়ার’

স্টাফ রিপোর্টারঃ কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্তৃত্ব নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর আর কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টের মধ্যে চলছে রশি টানাটানি। ট্রাস্ট গঠিত হওয়ার পরেও এর কর্তৃত্ব ছাড়েনি স্বাস্থ্য অধিদফতর। এই ক্লিনিকগুলো এখনও চলছে অধিদফতরের একজন লাইন ডিরেক্টরের স্বেচ্ছাচারিতায়। অন্যদিকে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো পরিচালনার পুরো কর্তৃত্ব হাতে পেতে দৌড়ঝাপ দিয়ে যাচ্ছেন এ সংক্রান্ত ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতি, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। জানা যায়, কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট হওয়ার পরেও এখানে নিয়োগ, টেন্ডারসহ যাবতীয় কাজ স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন লাইন ডিরেক্টর নিজের স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে করছেন। এমনকি ট্রাস্টকে অবহিত না করেই বিভিন্ন টেন্ডারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং লোক নিয়োগের ঘটনা ঘটছে। অথচ যেদিন থেকে ট্রাস্ট গঠিত হয়েছে আইনত সেদিন থেকেই কমিউনিটি ক্লিনিকের সমস্ত দায়-দায়িত্ব, অধিকার ট্রাস্টের উপরে বর্তায় বলে সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট বিলে সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ওই দিনই এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। নিয়মানুযায়ী তখন থেকেই কমিউনিটি ক্লিনিক পুরোপুরি ট্রাস্টের অধীনে চলে যাওয়ার কথা। এ সংক্রান্ত  আইনেও একই কথা বলা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্ট আইনের হেফাজত অংশে বলা আছে, (ক) ৩০ জুন ২০১৫ এ সমাপ্ত ‘Revitalization of Community Health Care Initiatives in Bangladesh (RCHCIB)’ শীর্ষক প্রকল্প, অতঃপর সমাপ্ত প্রকল্প বলিয়া উল্লিখিত, এবং Community Based Health Care শীর্ষক অপারেশনাল প্ল্যান, অতঃপর উক্ত প্ল্যান বলিয়া উল্লিখিত, উহার কার্যালয়ের সকল স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি এবং নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ ও জামানত, সকল দাবি, হিসাব বহি, রেজিস্টার, এবং অন্যান্য দলিল ট্রাস্টে ন্যস্ত হইবে; (খ) সমাপ্ত প্রকল্প ও অপারেশনাল প্ল্যানের অধীন প্রকল্প কার্যালয় বা কমিউনিটি ক্লিনিক কর্তৃক কৃত কোনো কার্য বা গৃহিত ব্যবস্থা বা ইস্যুকৃত বিজ্ঞপ্তি ট্রাস্ট কর্তৃক কৃত, গৃহিত বা ইস্যুকৃত বলিয়া গণ্য হইবে; (গ) সমাপ্ত প্রকল্প ও অপারেশনাল প্ল্যানের সকল দায়-দায়িত্ব ট্রাস্টের দায়-দায়িত্ব বলিয়া গণ্য হইবে।
কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট আইন প্রণয়নের পরে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীকে ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়। ব্যবস্থাপনা পরিচালক করা হয়  অতিরিক্ত সচিব ড. মো. ইউনুস আলী প্রামাণিককে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকের কর্তৃত্ব ট্রাস্টের অধীনে আসেনি। এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতর ও ট্রাস্টের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পে এ পর্যন্ত যারা কাজ করে আসছেন এরা মূলত স্বাস্থ্য অধিদফতরেরই কর্মকর্তা-কর্মচারী। এরাই ট্রাস্টের অধীনে কার্যক্রম হস্তান্তরে গড়িমসি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ৭ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে বলা হয় জুন পর্যন্ত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো আগের  নিয়মে চলবে। এরপর থেকে এটি পুরোপুরি ট্রাস্টের অধীনে হস্তান্তর করা হবে। জুনের মধ্যে ক্লিনিকগুলো ট্রাস্টের অধীনে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মপ্রধানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি নেই বলে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনুস আলী প্রামাণিক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তিনি জানান, কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখনো আগের মতোই লাইন ডিরেক্টর ডা. আবুল হাশেমের অধীনে চলছে। ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. মোদাচ্ছেরের অভিযোগ, আবুল হাশেম কমিউনিটি ক্লিনিক প্রকল্পের পিডি থাকাকালে ব্যাপক লুটপাট করেছেন। এখন তিনি সেই লুটপাটের লোভ সামলাতে পারছেন না। সে কারণেই তিনি সহজে এটি ট্রাস্টের অধীনে ছাড়তে চাচ্ছেন না।
ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনুস আলী প্রামাণিক জানান, লাইন ডিরেক্টরের অধীনে ৯ টি কম্পোনেন্ট বরাদ্দ আছে। এর ৪ টি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের অধীনে এবং ৫ টি কমিউনিটি ক্লিনিক সংক্রান্ত। আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত হয়েছিলো এই ৫ টি কম্পোনেন্ট আলাদা করা হবে এবং পৃথক কোডে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হবে। তবে সে ব্যাপারেও এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি হয়নি।
তবে লাইন ডিরেক্টর আবুল হাশেম বলছেন, বর্তমানে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো কমিউনিটি বেজড হেলথ কেয়ার অপারেশনাল প্ল্যানের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে এটি ট্রাস্টের অধীনে যাবে বা গেলে এটি কীভাবে পরিচালিত হবে সেই দিক নির্দেশনা এখনো নেই। এছাড়া আইন হলেও এখন পর্যন্ত ট্রাস্টের কোনো প্রবিধানমালা, অগ্রানোগ্রাম চূড়ান্ত হয়নি। সব মিলিয়ে এরকম একটি অবস্থায় ক্লিনিকগুলো ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করলে অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে বলেই এখনই হস্তান্তর করা যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, দেশে বর্তমানে ১৩ হাজার ৮০০ কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। সরকারি অর্থে প্রতিটি ক্লিনিকের নিজস্ব ভবন রয়েছে। প্রতিটি ক্লিনিকে একজন করে কমিউনিটি হেলথকেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যাদের মাসিক বেতন সাকুল্যে  ১৭, ৫০০টাকা করে। এই কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর প্রতিটিতে বছর  ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকার ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
এসব কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে সপ্তাহে ৩ দিন করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে একজন চিকিৎসক ও একজন পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসা সেবা দেয়ার কথা। কিন্তু সেই নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। উপজেলা পর্যায় থেকে কোনো চিকিৎসকই নিয়মিত কমিউনিটি ক্লিনিকে যান না।  এমনকি এগুলো মনিটরিং করার জন্য ডিসি এবং ইউএনওদের প্রতি নির্দেশনা থাকলেও সেই মনিটরিংও যথাযথভাবে হয় না। অথচ কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট আইনের সমন্বয় ও তদারকি অধ্যায়ে বলা আছে (৩) জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারগণ কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করিবেন। আইনে এও বলা আছে (১) স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য অধিদফতর, বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য), জেলা সিভিল সার্জন, উপ-পরিচালক পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের সহিত সুষ্ঠু সমন্বয়ের মাধ্যমে কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহের কার্যক্রম পরিচালিত হইবে। কিন্তু  আইনে সমন্বয়ের কথা বলা হলেও ভুক্তভোগীরা বলছেন, কর্মকর্তাদের সেই সমন্বয়ও ঠিকভাবে হচ্ছে না। ফলে কমিউনিটি ক্লিনিকের কাজ-কর্মে অনেকটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এছাড়া যারা প্রকল্পের অধীনে ছিলো তাদের অনেকে ট্রাস্টের অধীনে যেতে রাজিও হচ্ছেন না। তারা মনে করছেন, ট্রাস্টের অধীনে গেলে চাকরিতে সুযোগ সুবিধা কমে যাবে। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার লোকের সংশ্লিষ্টতা থাকলে জবাবদিহিতাও বাড়বে।
এদিকে কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে পুরোপুরি কর্তৃত্ব না পেলেও চেষ্টা তদবির চালিয়ে যাচ্ছেন সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী। ইতিমধ্যে ট্রাস্টের অফিস খরচ বাবদ ২ কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়েছেন সরকারের কাছ থেকে। আর ট্রাস্টের জন্য সরকারের কাছে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছেন তিনি।
এই ট্রাস্টের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং ট্রাস্টের তহবিল ব্যবহার করে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া। ট্রাস্টে সরকারি থোক বরাদ্দ থাকবে, অনুদান থাকবে। পাশাপাশি বেসরকারিভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, স্থানীয় সামাজিক সংগঠন বা ব্যক্তি বিশেষ এখানে দান বা অনুদান করতে পারবেন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০০ সালে একটি প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি ইউনিয়নে ৩ টি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়। এখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সরকারের পক্ষ থেকে ৩০ প্রকার ওষুধ সরবরাহ করা হয় এখানে। কিন্তু চালু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে সরকার পরিবর্তনের ফলে বন্ধ হয়ে যায় ক্লিনিকগুলো। আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ফের চালু করা হয় এ ব্যবস্থা। প্রতিটি কমিউনিটি ক্লিনিকে একজন করে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার নিয়োগ দেয়া হয়। এদিকে ট্রাস্ট আইন অনুমোদনের পর এর কর্তৃত্ব নিয়ে দোটানার কারণে বেকায়দায় পড়েছেন গ্রামের স্বাস্থ্যসেবা প্রার্থী সাধারণ মানুষ। উপরমহলে অস্থিরতার কারণে এবং মনিটরিংয়ের অভাবে পযমন তেমনভাবে চলছে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো। ফলে সেবাপ্রার্থীরা বঞ্চিত হচ্ছেন কাংখিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে।

নিউজটি শেয়ার করুন..

     এই বিভাগের আরো খবর
ব্রেকিং নিউজঃ